বুধবার ০২ এপ্রিল ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। গবাদি পুশুর হালাল মাংস ও হাড় থেকে তৈরি প্রাণিজ প্রোটিন বা মিট অ্যান্ড বোভাইন মিল (এমবিএম) আমদানির মাধ্যমে দুই দেশ উপকৃত হবে। বিশেষ ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে পতিত হাসিনা সরকারের আমলে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্যে আমেরিকার থেকে প্রাণিজ প্রোটিনে ব্যবহৃত বোভাইন মিল (এমবিএম) আমদানি বন্ধ করা হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবাদি পুশুর হালাল মাংস ও হাড় থেকে তৈরি প্রাণিজ প্রোটিন আমদানির মাধ্যমে দু’দেশের ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে পর্বত সমান বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করেছে ৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২৪ সালে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে।
তিনি বলেন, কোভিড-পরবর্তী প্রভাবগুলো, অন্যান্য সমস্ত বিশ্ব সংকটের সাথে, বাজার এবং অর্থনীতিকে কীভাবে নতুন রূপ দিয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সমস্যা, সুরক্ষা, সম্মতি, উদ্ভাবন এবং বৈচিত্র্যের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার বাংলাদেশের ক্ষমতা প্রদর্শন করে। ফলস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাক পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থান অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেট ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০২৪ সালে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য বাণিজ্য আনুমানিক ১০.৬ বিলিয়ন ডলার ছিল। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি ছিল ২.২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ এর তুলনায় ১.৫ শতাংশ কম (৩৪.০ মিলিয়ন ডলার) হয়েছে।
অপরদিকে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানি হয়েছে ৮.৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ এর তুলনায় ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি (৮৯.৩ মিলিয়ন ডলার) পেয়েছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশে পণ্য বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি ছিল ৬.২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ এর তুলনায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি (১২৩.২ মিলিয়ন ডলার) পেয়েছে।
ফ্যাসিস্ট আমলে সরকারিভাবে ‘হারাম’ তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয় প্রাণিজ প্রোটিন বা মিট অ্যান্ড বোভাইন মিল (এমবিএম)। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৌশলে প্রাণিজ প্রোটিন আমদানির বাজার নিয়ন্ত্রণ নেয় আস্থা ফিড। ফ্যাস্টিট চলে গেলেও তাদের দোসর সেই আস্থা ফিডের নিয়ন্ত্রণেই প্রোটিন আমদানি মার্কেট। এই কারসাজির নেপথ্য হোতাদের (পতিত ফ্যাসিস্ট প্রধান শেখ হাসিনা, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ) অনেকেই গত ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়ে পালালেও আস্থা ফিডের সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে।
প্রাণিজ প্রোটিন বা এমবিএম নিয়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বলছেন, স্বৈরাচার সরকার এমবিএম আমদানি নিষিদ্ধ করে আস্থা ফিডকে দেশি-বিদেশি মার্কেট দখলের সুযোগ দেয়। এমবিএম আমদানির নামে এলসির মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে ফ্যাসিস্ট প্রধান ও এমপি-মন্ত্রীরা। শুধু তাই নয়, আস্থা ফিডের মালিকপক্ষও নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০০ ভিলার খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে ২০টি ভিলার নির্মাণব্যয় বহন করেছেন আস্থা ফিডের ডিরেক্টর ও হাছান মাহমুদের ভাগিনা গিয়াস উদ্দিন। এ ছাড়াও হাসিনা থেকে শুরু করে অসংখ্য পলাতক নেতাদের বিদেশে পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক জোগান দেওয়ার অভিযোগও উঠছে আস্থা ফিডের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, শূকরের হাড় ও মাংসের নির্যাস থেকে এমবিএম তৈরি হয়- এমন অজুহাতে ২০১৮ সাল থেকে এমবিএম বা প্রাণিজ প্রোটিন আমদানি নিষিদ্ধ করে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার। এতে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা, ব্রাজিল ও ইউরোপ থেকে বোভাইন মিল আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় এ নিয়ে ধর্মের দোহাই দেওয়া হয়।
যদিও মুসলিম প্রধান দেশ পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও কমমূল্যে উন্নতমানের এমবিএম আমদানি করছে। যার ফলে সেসব দেশে মুরগি, ডিম ও মাছের দাম তুলনামূলক কম। অথচ আস্থা ফিডের মাধ্যমে আমদানি করা এমবিএম বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। মাছ, মুরগিকে ঠিকই খাওয়ানো হচ্ছে মিট অ্যান্ড বোভাইন মিল বা এমবিএম। কারসাজির মাধ্যমে শুধুমাত্র আস্থা ফিডকে সুযোগ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে চাহিদা থাকার পরও পোলট্রি ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এদিকে একচেটিয়া বাজার দখলের কারণে প্রোটিনের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বহু পোল্ট্রি ব্যবসায়ী লোকসানে পড়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। যার প্রভাবে মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম প্রায় সময়ই ঊর্ধ্বমুখী থাকে।
এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে প্রতি বছর বোভাইন মিলের চাহিদা ৪২ হাজার মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ২৪০ মিলিয়ন ডলার (২৯০ কোটি টাকার বেশি)। দেশের সব আমদানিকারকরা আমদানি করতে পারলে এই চাহিদা যেমন সহজেই মেটানো যেতো, তেমনি বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব কয়েকগুণ কমে যেত।