নিজস্ব প্রতিবেদক:
শুক্রবার, ৬ জুন, ২০২৫
চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুতে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে ফের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় ৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দুর্ঘটনার আতঙ্ক তাড়া করছে।
এদিকে রেলওয়ের বরখাস্ত- ৪ জনের মধ্যে তিনজনের খোঁজ মিলছে না। এরমধ্যে আছেন লোকোমাস্টার গোলাম রসুল, সহকারী লোকোমাস্টার আমিন উল্লাহ, ট্রেনের গার্ড সোহেল রানা। ধারণা করা হচ্ছে তারা দায় এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ ঘটনায় অস্থায়ী গেট কিপার মাহবুবকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকে তিনজনের খোঁজ মিলছে না। তারা হয়তো সটকে পড়েছেন। তদন্ত কমিটি শুক্রবার থেকে কাজ শুরু করেছে।
অপরদিকে রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার জন্য শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। তবে রেল পুলিশের পক্ষ থেকে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ জুন) সাড়ে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে বোয়ালখালী উপজেলার সেতুর পূর্ব প্রান্তে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে রেল পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে নিয়ম না মেনে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন সেতুতে দ্রুত উঠে যায়। এতে রেল লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি মোটর সাইকেল সরে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। ফলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনের লোকোমাস্টারের (চালক) ভুলে দুর্ঘটনার ঘটেছে বলে রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন। শুক্রবার লোকোমাস্টারসহ ৪ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি। শুক্রবার থেকেই কমিটি দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উৎসুক জনতার ভিড় লেগেই ছিল সেতুর পূর্ব প্রান্তে। তারা দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় দায়ীদের কঠিন শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে দুর্ঘটনার আগে সেতুর ওপর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নষ্ট হয়ে যানজট তৈরি হয়। নিয়ম অনুযায়ী ট্রেন সেতুতে ওঠার আগে পূর্ব প্রান্তে ক্লিয়ারেন্সের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। লাইনম্যানের সংকেত পেলে সেতুতে চলতে শুরু করে ট্রেন। কিন্তু পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনম্যানের লাল পতাকা সিগন্যাল উপেক্ষা করে দ্রুত উঠে পড়ে সেতুতে। এতে সিএনজি অটোরিকশাসহ মোটর সাইকেল দুমড়েমুচড়ে গেলে তিনজন নিহত হয়।
চান্দগাঁও থানার ওসি মো,আফতাব উদ্দিন বলেন, কালুরঘাট সেতুতে ট্রেন সিএনজি মোটর সাইকেল সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের একজন শিশু।
এদিকে দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করেন। রাত পৌনে ১১টার দিকে কালুরঘাট ফায়ার স্টেশনের ইউনিট ও রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে সেতু থেকে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সিএনজি মোটর সাইকেল সরিয়ে নেয়া হয়। শুক্রবার ভোর রাত তিনটার দিকে ট্রেনের জন্য নিয়ে আসা হয় অন্য দুই লোকোমাস্টার। এরপর ট্রেনটি সেতু থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়।
দুর্ঘটনা নিয়ে সেতুর পশ্চিম প্রান্তের জানালিহাট স্টেশন মাস্টার মো. নেজাম উদ্দিন বলেন, পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসে সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে। রাত ১০টার পর কালুরঘাট সেতু এলাকায় পৌঁছায়। এ সময় সেতুর ওপর কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল ছিল। সেতুর ওপর একটি গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অন্য গাড়িগুলো আটকে ছিল। নিয়ম হলো, ট্রেন সেতুটির পূর্ব প্রান্তে এসে দাঁড়াবে। এরপর লাইনম্যানের সংকেত নিয়ে সেতুতে উঠবে। কিন্তু ট্রেনটি সংকেত অমান্য করে দ্রুতগতিতে সেতুতে উঠে যায়। এর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। এতে লোকজন হতাহত হয়।
দুর্ঘটনার বিষয়ে বোয়ালাখালী গোমদন্ডি রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার আজম উদ্দিন বলেন, সেতুতে উঠার আগে সিগন্যাল উপেক্ষা করে ট্রেনটি দ্রুতগতিতে উঠে গিয়েছিল। সেতুর ওপর সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ছিল। সেতুর ওপর একটি গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে সব গাড়ি সেতু থেকে নামতে পারেনি। ফলে দ্রুতগতির ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজি মোটরসাইকেল দুমড়ে মুচড়ে হাতহতের ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশু কন্যার দাফন সম্পন্ন
বৃহস্পতিবার রাতে কালুরঘাট সেতুতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ২ বছরের শিশু মেহেরিমা নূর আয়েশা। কুরবানির ঈদের ছুটি কাটাতে স্ত্রী ও কন্যাসন্তান মেহেরিমা নূর আয়েশাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফিরছিলেন বাবা সাজ্জাদুন নূর। নগরীর বহদ্দারহাট থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন বোয়ালখালী উপজেলার পূর্বগোমদন্ডীর বাড়িতে যেতে। কিন্তু কালুরঘাট সেতুতে পর্যটক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় তাদের সিএনজি অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এসময় শিশুর পিতা সাজ্জাদুন নূর ও তাঁর স্ত্রী জুবাইয়া ইসরা বেঁচে গেলেও মারা যায় ২ বছর বয়সী আয়েশা।
দুর্ঘটনার পর পরই শিশু আয়েশা ও তাঁর মাকে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চিকিৎসকেরা আয়শাকে মৃত ঘোষণা করেন। আর তাঁর মা এখনো চিকিৎসাধীন। শুক্রবার দুপুরের দিকে একবার সংজ্ঞা ফিরে এলে খোঁজ নেন শিশু আয়েশার। এরপর আবার অচেতন হয়ে পড়েন।









