উড়োজাহাজগুলো একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ছে। এতে ফ্লাইট শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।

এক মাসে ১৮ উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি গত এক মাসে আকাশপথে বিমানের অন্তত ১৮টি উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। এর কোনোটি উড্ডয়নের পর গন্তব্যের মাঝপথ থেকে দেশে ফিরে এসেছে। আবার কোনোটিতে উড্ডয়নের আগেই ধরা পড়েছে ত্রুটি। পাইলটের অজান্তে আকাশ থেকে উড়োজাহাজের চাকা খুলে মাটিতে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রায় সব ঘটনাই ঘটেছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে।

এসব ঘটনার পরও তেমন হেলদোল নেই বিমানের। অথচ এসব কারণে বিমানে নিয়মিত ভ্রমণকারীরা বিরক্ত হয়ে অন্য এয়ারলাইন্স বেছে নিচ্ছেন। ফলে যাত্রী হারানোর পাশাপাশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। এতে লাভের বদলে ভারী হচ্ছে লোকসানের পাল্লা।

যদিও বিমানের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উড়োজাহাজে কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে হ্যাঙ্গারে নেওয়া হয়। সেখানে মেরামত শেষে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, উড়োজাহাজ উড্ডয়নের পর আবার অন্য ত্রুটি ধরা পড়ছে। গত এক-দেড় মাস ধরে এমন ঘটনা বেশি ঘটছে।

তখন সরকার নতুন করে ২৫টি বোয়িং যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার চিন্তা করছে। এখন বিমানের বহরের ২১টি এয়ারক্রাফটের মধ্যে ১৬টি বোয়িং। এর মধ্যে ছয়টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর আর ছয়টি ন্যারোবডির বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ রয়েছে। এর বাইরে বিমানের বহরে স্বল্প দূরত্বের রুটে চলাচল উপযোগী পাঁচটি ড্যাশ- ৮০০ উড়োজাহাজ রয়েছে।

সবশেষ মঙ্গলবার ঢাকা-কুয়েত ও দুবাই রুটের উভয় ফ্লাইটই বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দিয়ে পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজ সংকটে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটের ঢাকা-কুয়েত রুটের বিজি ৩৪৩ ফ্লাইট এবং বিকেল ৫টা ৫ মিনিটের ঢাকা-চট্টগ্রাম-দুবাই ফ্লাইট দুটিই বাতিল করতে হয়।

যে কোনো যান্ত্রিক যান পুরোনো হলে এর যন্ত্রাংশে ত্রুটি দেখা দেবেই। আর বিমানের কোনো যন্ত্রে যদি ত্রুটি দেখা দেয়, সেটি মেরামতের সুযোগ নেই। এজন্য পুরো যন্ত্রটিই পরিবর্তন করতে হয়। এ কারণে প্রকৌশল বিভাগকে দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়।- বিমানের সাবেক বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম

কাজের ভিসায় কুয়েত যাওয়ার উদ্দেশ্যে মঙ্গলবার সকালে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন টাঙ্গাইলের আমির হোসেন। যথাসময়ে বোর্ডিং করার জন্য গেলে বিমানের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, আজকের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। তাদের ফ্লাইট আগামীকাল দেওয়া হবে।

পরে বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থান করছিলেন আমির হোসেনসহ অন্য যাত্রীরা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিমানের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন আগামীকাল তারা ফ্লাইট দেবেন। কিন্তু এই সময় পর্যন্ত যাত্রীরা কোথায় থাকবেন এবং আগামীকাল কয়টায় ফ্লাইট তা সুনির্দিষ্ট করে জানায়নি।’

এর আগে সোমবার দুপুরে বিমান বহরের ড্যাশ-৮ মডেলের (এসটুএকেই) একটি উড়োজাহাজ দিয়ে চট্টগ্রামগামী বিজি৬১৫ ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। কিন্তু উড্ডয়নের পর কেবিনের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় বৈমানিক উড়োজাহাজটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। পরে অন্য একটি উড়োজাহাজে করে যাত্রীদের চট্টগ্রামে পাঠানো হয়।

এ ঘটনার ১২ ঘণ্টা আগে রোববার (১০ আগস্ট) যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালি থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকাগামী ফ্লাইট (বিজি ৩৫৬) বাতিল করা হয়। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে রোমের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ফিউমিসিনো বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশ্যে উড্ডয়নের কথা ছিল। বর্তমানে উড়োজাহাজটি গ্রাউন্ডেড অবস্থায় বিমানবন্দরে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী উড়োজাহাজের ২৬২ যাত্রীকে হোটেলে পাঠিয়েছে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত যাত্রীরা হোটেলেই ছিলেন।

বিমানের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, এ উড়োজাহাজের ফ্ল্যাপে ত্রুটি শনাক্ত করেন প্রকৌশলীরা। ফ্ল্যাপ হচ্ছে একটি উড়োজাহাজের ডানায় স্থাপিত সেই যন্ত্রাংশ যা দিয়ে উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে ফ্ল্যাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি মেরামত করার জন্য লন্ডন থেকে রোমে যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়েছে। এরপর ত্রুটি সারিয়ে একই ফ্লাইটে যাত্রীদের রোম থেকে দেশে ফেরানো হবে। কিন্তু এটি মেরামত করতে ঠিক কত সময় লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি বিমান।

যদিও বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোমে যাত্রীদের জন্য বিকল্প কোনো ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। উড়োজাহাজটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীরা বিমানের খরচে হোটেলেই থাকবেন।

তবে বিমানের ফ্লাইটে নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন কুমিল্লা সদরের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে জানান, তিনি রোমের একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। দেশে যাওয়ার জন্য কোম্পানি মাত্র ২২ দিনের ছুটি দিয়েছে। কিন্তু বিমানের উড়োজাহাজে ত্রুটি থাকায় রোমেই আটকে আছেন। কখন নাগাদ ফ্লাইট ছাড়বে তা বুঝতে পারছেন না।

একের পর এক অঘটন, আকাশপথে বিপদ বাড়ছে বিমানেরতিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের মার্চে রোম ফ্লাইট চালু হওয়ার পর থেকে বিমানের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করছেন প্রবাসীরা। এখন নিজের চোখেই তা দেখলাম। এমন অব্যবস্থাপনায় একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না।’

গত শনিবার (৯ আগস্ট) সকালে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামার পর বিমানের একটি বোয়িংয়ে সমস্যা দেখা দেয়। সেটি সারিয়ে দুই ঘণ্টা বিলম্বে উড়োজাহাজটি যাত্রীদের নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা করে।

বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাতে বিমানের আবুধাবিগামী একটি বোয়িং উড়োজাহাজ ওড়ার এক ঘণ্টা পর আবার ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসে। উড়োজাহাজটির তিনটি টয়লেটেরই ফ্লাশ একযোগে কাজ না করায় ভেতরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, পরে পাইলট সেটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন। পরে অন্য একটি ফ্লাইটে যাত্রীদের আবুধাবি পাঠানো হয়।

তার একদিন আগে বুধবার (৬ আগস্ট) ঢাকা থেকে ওড়ার একঘণ্টা পর মিয়ানমারের আকাশ থেকে ফিরে আসে ব্যাংককগামী বিমানের একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ। ওড়ার কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিনে অতিরিক্ত কম্পন হচ্ছে বুঝতে পেরে ঢাকায় ফিরে আসেন পাইলট।

গত ৩০ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ে শারজাহ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট বিজি-৩৫২।

জানা যায়, এই বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজটি দিয়েই পরিচালনা করার কথা ছিল ঢাকা থেকে ব্যাংককগামী বিজি-৩৮৮ ফ্লাইট। ফলে শারজাহ ফ্লাইটের বিলম্বের কারণে ব্যাংকক ফ্লাইটও নির্ধারিত সময় বেলা ১১টায় ছাড়তে পারেনি। পরে ব্যাংককগামী ফ্লাইটটি দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ঢাকা ছেড়ে যায়।

গত ২৯ জুলাই ইতালির রোমের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় বিমানের বিজি-৩৫৫ ফ্লাইটটি অবতরণ করে। যাত্রী ব্যাগেজ দেওয়ার সময় ১০ নম্বর লাগেজ বেল্টে অসংখ্য তেলাপোকা, পোকামাকড় ও তীব্র দুর্গন্ধ পায় ফিউমিচিনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তাৎক্ষণিকভাবে রোম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যাগেজ ডেলিভারি স্থগিত করে। এরপর বিমানবন্দর স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল জীবাণুনাশক কার্যক্রম শুরু করে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়ে প্লেনের ব্যাগেজ কনেটইনার পোকামাকড় মুক্ত করা হয়।

ওই দিনই রোমের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বিজি-৩৫৫ ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বিমানের উড়োজাহাজটির ব্যাগেজ কনটেইনার জীবাণুমুক্ত করতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। পরে সব কাজ শেষ করে রাত সোয়া ১১টায় উড্ডয়নের অনুমতি দেয় রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ওই সময় যাত্রীরা উড়োজাহাজের ভেতরে আটকে ছিলেন।

এ ঘটনা জানিয়ে গত ৩১ জুলাই ঢাকায় বিমানের সদর দপ্তরে একটি চিঠি দেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রোম স্টেশন ম্যানেজার মো. মোস্তাফিজুর রহমান। চিঠিতে যাত্রী ও ব্যাগেজ গ্রহণের সময় বিমানের সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত ২৮ জুলাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝ আকাশ থেকে ফেরত আসে ঢাকা-দাম্মাম রুটের ফ্লাইট, বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর কেবিন প্রেশারে বিপদ সংকেত পেলে পাইলট নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকায় ফিরে আসেন।

তার চারদিন আগে গত ২৪ জুলাই দুবাই থেকে চট্টগ্রামে এসে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে বিমানের আরেকটি বোয়িং ড্রিমলাইনার। উড্ডয়নের কিছু সময় পর পাইলট ল্যান্ডিং গিয়ারের দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করলে সেটি আবার চট্টগ্রামে ফিরে যায়। ত্রুটি মেরামত শেষে দুই ঘণ্টা পর সেটি আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

তার আটদিন আগে গত ১৬ জুলাই রাতে ‘চাকায় ত্রুটি’ দেখা দেওয়ায় বিমানের দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা রুটের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘গ্রাউন্ডেড’ করা হয়। বিমানের আরেকটি ফ্লাইটে চাকা ও যন্ত্রাংশ পাঠানো পর উড়োজাহাজটি মেরামত করা হয়। ৩০ ঘণ্টা বিলম্বে দেশে ফেরে উড়োজাহাজটি।

আমারদেশ২৪ নিউজ।