রোববার, ৬ জুলাই, ২০২৫
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে একের পর এক থানা ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হতে শুরু করলে সারা দেশেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পুলিশি কার্যক্রম। বিশেষ করে একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক নেতাদের মতো ভূমিকা এবং অতিরিক্ত বল প্রয়োগের কারণে বিক্ষুব্ধ মানুষের হামলারলক্ষ্যবস্তু হয় তারা। এরপর যখন নতুন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, মনোবলের ভঙ্গুর দশা থেকে উত্তরণের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে আইন প্রয়োগ করতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। আসামি ধরতে গিয়ে বাধার মুখে পড়া থেকে শুরু করে মারধরের শিকার এমনকি থানা ভাঙচুর, ঘেরাও ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনাকে ভঙ্গুর মনোবলে আবারও ভাঙন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সেটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অপশক্তির ইন্ধন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনগণের আস্থার সংকটকে কাজে লাগিয়ে পুলিশকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে স্বার্থান্বেষী মহল। কেননা সামনে জাতীয় নির্বাচন। পুলিশকে দুর্বল করা গেলে এর ফায়দা নিতে পারবে মহলগুলো। এ ছাড়া পুলিশ আক্রান্ত হতে থাকলে আইনি সেবা পাওয়া নিয়ে সংশয়ে পড়বে সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পেতে হলে কেউ আইনের ব্যত্যয় ঘটালে দ্রত সময়ের মধ্যে কঠোর, দৃষ্টান্তমূলক ও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা আরও বাড়বে। যদিও পুলিশ সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, পুলিশের মনোবল নতুন করে ভাঙনের কিছুই নেই। পতন ঘটা সরকারই পুলিশের মনোবলের ১২টা বাজিয়ে দিয়ে গেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ সদর দফতর কাজ করে যাচ্ছে। কেউ পুলিশকে টার্গেট করে অপতৎপরতা চালালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা আর ঘটবে না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পর্যায়ের অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই বলছেন, তাদের দায়িত্ব দেশের নাগরিক ও সম্পদ রক্ষা করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। কিন্তু তারা আক্রান্ত হলে তাদের কে রক্ষা করবে সেই নিশ্চয়তাটুকুই তারা পাচ্ছেন না। সম্প্রতি থানা ঘেরাও ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তারা বিষ্মিত।
গত বুধবার লালমনিরহাটের পাটগ্রামে পাথরবাহী ট্রাক থেকে টাকা আদায়ের দায়ে দুজনকে কারাদণ্ডের ঘটনায় থানায় হামলা ও ভাঙচুর এবং পাশের হাতিবান্ধা থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা যাতে পাটগ্রামে উদ্ধার করতে যেতে না পারেন, সে জন্য ওই থানা অবরুদ্ধ করা হয়।
বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের পটিয়ায় ছাত্রদের লাঠিপেটার অভিযোগে থানা ঘেরাও ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাকেও পুলিশের মনোবলে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেননা পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুল করলে সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা যথাযথ কর্তৃপক্ষের। সেটি না করে থানা ঘেরাও সংস্কৃতি তৈরি হতে যাওয়ায় আতঙ্কিত অনেক পুলিশ সদস্যই।
। এর বাইরেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সময়ে পুলিশ আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে এবং পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বিরূপ আচরণের বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, পতন ঘটা আগের সরকার পুলিশের মনোবলের ১২টা বাজিয়ে দিয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে পুলিশের মনোবলে ভাঙন ধরার কিছু নেই। কারণ পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় ঝড় পুলিশের ওপর দিয়েই গেছে। সেই জায়গা থেকে পুলিশ যতটা রিকভার হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে ৩টি থানা ঘিরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছেÑপ্রত্যেকটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। যারা জড়িত ছিল তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সুতরাং মনোবল ভেঙে পড়ার কিছু দেখছি না। তবে এই ঘটনাগুলো জনতার আইন হাতে নেওয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমরা দেখছি। ভবিষ্যতে আর কেউ আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটাতে সাহস পাবে না বলে আশা করি।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার জুয়েল সময়ের আলোকে বলেন, পুলিশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এই মুহূর্তে পুলিশকে টার্গেট করে মব সৃষ্টি করা, থানা ঘেরাও এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটালে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানো বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের জনগণ পুলিশের পাশে না দাঁড়ালে পুলিশের মনোবল শক্ত অবস্থায় ফিরবে না। এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে।









